গোপনীয়তার অধিকার যখন লঙ্ঘিত

                                                 

                                                                  


আধারের পর এবার কো উইন অ্যাপ্লিকেশন থেকে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠল । 

পূর্বে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, এয়ার ইন্ডিয়া কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্তপূর্ণ সংস্থার তথ্য ফাঁস হওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। ২০২০ সালে একটি সাইবার সুরক্ষা সংস্থা জানায় ন্যাশনাল ডু নট কল রেজিষ্ট্রির ৯ কোটির বেশি ফোন নম্বর ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি তেলেঙ্গানা সাইবারবাদ পুলিশ দেশের সর্বোচ্চ তথ্য চুরি যাওয়ার বিষয়টি উন্মোচন করেছে যেখানে ৬৭ কোটি ভারতীয়র তথ্য ফাঁস হয়েছে। এই বছর সার্ফশার্ক নামক সুইডেনের একটি ডাটা সিকুউরিটি কোম্পানির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া দেশের র‌্যাঙ্কিং এ ভারতের স্থান পঞ্চম যেখানে কেসের সংখ্যা বারো লাখ । সংখ্যাটি আশঙ্কাজনক। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী গোপনীয়তার অধিকার ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। যে অধিকার কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্র ক্ষুন্ন করতে পারে না। কিন্ত এখন বিনা অনুমতিতে বিভিন্ন ভাবে ন্যাভিগেট হচ্ছে মানুষের রাজনীতি থেকে চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য, অনলাইন কেনাবেচার তথ্য থেকে জেনেটিক ইনফরমেশন এমনকি ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য । ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জেনারেল ডাটা প্রটেকশন রেগুলেশন এর মত কোনো সুরক্ষাবিধি ১৪০ কোটির দেশে এখনও স্বপ্ন। গত এক দশক ধরে তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি আলোচনার বিষয় । ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট ২০১১ বর্তমান সময়ে তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে ব্যাপকতা হারিয়েছে। 

২০১৭ সালের বিচারপতি কে এস পুট্টস্বামী বনাম ভারত সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকার ঘোষণার পর তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তার বিষয়ে পৃথক আইন প্রণয়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক জাস্টিস বি এন শ্রীকৃষ্ণার নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি প্যানেল নিয়োগ করে । ২০১৮ সালে প্যানেল একটি খসড়া বিল পেশ করে যা ২০১৯ সালে পার্লামেন্টে উপস্থাপিত হয়। কিন্ত বিল উপস্থাপনের পরে তা বিভিন্ন ভাবে সমালোচিত হয়। বিভিন্ন টেক জায়ান্ট কোম্পানি সমালোচনা করে বলে ডাটা লোকালাইজেশন নিয়ম গুলি অত্যান্ত অনমনীয় ।

বিভিন্ন বিতর্ক ও সমালোচনার পর ২০২২ এর আগস্ট মাসে সরকার ডাটা প্রটেকশন বিল ২০১৯ ফেরৎ নেয়।  

অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দ্যা ডিজিটাল পার্সোনাল ডাটা প্রটেকশন বিল ২০২২ নামে একটি নতুন খসড়া বিল প্রকাশ করে সরকার । এই বিলটি জনগণের গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে বেশ আশাপ্রদ একটি খসড়া বলা যায় । ব্যক্তিগত তথ্য সম্পর্কে তথ্যের অধিকার , ইন্টারনেট থেকে সংশোধনের অধিকার এবং মুছে ফেলার অধিকার,কোনো ব্যক্তিকে নমিনি হিসেবে রাখার অধিকার, অভিযোগ নিষ্পত্তির অধিকার ,সম্মতি দেওয়ার অধিকার সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্তপূর্ণ নাগরিক অধিকার কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বিলটিতে । নতুন খসড়া বিলটি পুরনো বিলের তথ্য সুরক্ষাকে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার রূপ দেয় ।

যেখানে পুরনো বিলে পার্সোনাল ডাটা এবং নন পার্সোনাল ডাটা কে বিভক্ত করা হয়েছিল কিন্ত নতুন বিলে নন পার্সোনাল ডাটার কোনো ধারণা রাখা হয়নি । এখানে ডাটা ফিডুউসিয়ারি কোম্পানি শুধু মাত্র ব্যক্তিগত তথ্য হিসাবে ব্যবহারকারীর থেকে তথ্য অনলাইন সংগ্রহ করতে পারবে এবং যে তথ্য অফলাইন সংগ্রহ হয়েছে যা পরবর্তীতে ডিজিটালাইজড করা হয়েছে তা সংগ্রহে রাখতে পারবে । কিন্ত এক্ষেত্রে ব্যক্তির ব্যাক্তিগত উদ্দেশ্যের জন্য অনলাইন স্পেসে রাখা কোন তথ্য ডাটা ফিডুউসিয়ারি কোম্পানি অ্যাকসেস করতে পারবে না । যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিতে নতুন বিলে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। 

ভারতের বাইরে ব্যক্তিগত তথ্য স্থানান্তরের বিষয়টিও অনেকটা শিথিল করা হয়েছে । 

তবে ক্রস বর্ডার ডাটা ট্রান্সফারের ক্ষেত্র গুলিতে তা পরীক্ষা করে দেখা হবে । দায়িত্বশীল সংস্থা নিরাপত্তা সুরক্ষা গ্রহনে ব্যর্থ হলে ২৫০ কোটি এবং তথ্য ফাঁসের বিষয়ে অবহিত না করলে ২০০ কোটি পর্যন্ত আর্থিক জরিমানার প্রবিধান রাখা হয়েছে। একটি ডাটা প্রটেকশন বোর্ড গঠন করা হবে। তার নিয়োগ, অপসারণ এবং তার সমস্ত কার্যকরী ভূমিকা ন্যাস্ত থাকবে কেন্দ্র সরকারের হাতে । কিন্তু বোর্ডটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত রাখা বিশেষ প্রয়োজন ছিল। যেখানে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৭ সালে গোপনীয়তার অধিকারকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার নয় বলে দাবি করে। তবুও বিগত বছর গুলোতে যে পরিমাণ নাগরিকের তথ্য ফাঁস হয়েছে তাতে বিলটি অনেকটা আশার আলো সঞ্চার করছে আমাদের মনে। 


sauravsarker100@gmail.com

মন্তব্যসমূহ